পুরুলিয়ার সেই রাত যখন আকাশ থেকে হয়েছিলো অস্ত্রবৃষ্টি
১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরের রাত। পশ্চিমবঙ্গের শান্ত ও ধীর-স্থির জেলায়, পুরুলিয়ার আকাশে হঠাৎই এক অদ্ভুত শব্দ গুঞ্জন করতে থাকে। কিছু গ্রামবাসী লক্ষ্য করেন, তাদের মাথার ঠিক ওপর দিয়ে একটি উড়োজাহাজ অস্বাভাবিকভাবে নিচুতে ঘুরছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ থেকে পড়তে থাকে কাঠের বাক্সগুলো। ভোরের আলো ফুটতেই দেখা যায়, এগুলো শুধুই বাক্স নয়, বরং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে পূর্ণ। AK47 Rifle, Rocket Launcher, Night Vision Device, Explosives এবং এমনকি সোভিয়েত নির্মিত সামরিক অস্ত্রও ছিল এর মধ্যে।
এই ঘটনাটি ইতিহাসে খ্যাত পুরুলিয়া অস্ত্রকাণ্ড নামে, যা আজও রহস্যের আড়ালে অনেক প্রশ্ন রেখে গেছে।
ঘটনার সূচনা
১৭ ডিসেম্বরের রাত দেড়টা নাগাদ একটি অ্যান্টোনভ ২৬ কার্গো বিমান বাংলাদেশের জলসীমা পেরিয়ে ভারতের আকাশে প্রবেশ করে। বিমানটি কলকাতা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে পুরুলিয়ার জনশূন্য গ্রামাঞ্চলের ওপর নেমে আসে এবং বিভিন্ন স্থানে গোপনে অস্ত্র ফেলে।
পরের দিন সকালে গ্রামবাসী এবং পুলিশ বাক্সগুলো উদ্ধার করলে সবাই হতবাক। এত বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের অস্ত্র কীভাবে ভারতের আকাশসীমা ভেদ করে একটি বিমান ফেলতে পারল? আরও বড় প্রশ্ন কারা এই অস্ত্রের প্রকৃত গ্রাহক?
কারা ছিল মূল অভিযুক্ত?
তদন্তে উঠে আসে এক বিদেশি দলের নাম। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ড্যানিশ নাগরিক কিম ডেভিডসন (Kim Davy বা Niels Holck)। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন লাটভিয়ান এবং ব্রিটিশ নাগরিক এই অভিযানে যুক্ত ছিল।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, তারা ভারতের ভেতরে ধর্মীয়-সামাজিক সংগঠন আনন্দ মার্গ-এর কয়েকজন সদস্যকে অস্ত্র সরবরাহ করতে চেয়েছিল। যদিও এই দাবির সঠিকতা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। আনন্দ মার্গ সংগঠন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় প্রশ্নচিহ্ন
এই ঘটনার পর ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
-
আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে একটি বিমান কীভাবে ভারতের রাডারকে ফাঁকি দিল?
-
আকাশ পথে এত বড়সড় অবৈধ অস্ত্র ফেলা হলো, অথচ নিরাপত্তা বাহিনী টের পেল না?
-
বিমানটি অস্ত্র ফেলার পর আবার থাইল্যান্ডের উদ্দেশে উড়ে যেতে সক্ষম হলো কিভাবে?
পরবর্তীতে ভারতীয় বায়ুসেনা ওই বিমানটিকে ধরতে সক্ষম হয় এবং মুম্বাইতে তা অবতরণ করানো হয়। তখন আটক হয় পাইলটসহ ছয়জন বিদেশি নাগরিক, যদিও মূল অভিযুক্ত কিম ডেভিডসন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া
এই মামলার তদন্তে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা CBI যুক্ত হয়। দীর্ঘ তদন্তে জানা যায়, অস্ত্রগুলো রাশিয়া ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ধৃত লাটভিয়ান পাইলট ও সহকারীরা আদালতে দোষ স্বীকার করে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে সাজাও দেওয়া হয়েছিল, পরে কূটনৈতিক কারণে মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
কিম ডেভিডসনকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার জন্য ভারত বহু বছর ডেনমার্ক সরকারের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানালেও, মানবাধিকারজনিত আশঙ্কার কথা বলে ডেনমার্ক সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে।
কেন ফেলা হলো অস্ত্র? এখনো অমীমাংসিত রহস্য
এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে কয়েকটি তত্ত্ব জনপ্রিয়—
-
আনন্দ মার্গ সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অস্ত্র ফেলা হয়েছিল।
-
একটি আন্তর্জাতিক চক্র ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চেয়েছিল।
-
এটি ছিল বড়সড় গোয়েন্দা চক্রান্তের অংশ।
কারণ যাই হোক, ঘটনাটি ভারতের ইতিহাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড়সড় ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে।
পুরুলিয়ার মানুষের স্মৃতিতে সেই রাত
যারা সেই রাতের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, আজও তারা ভোলেন না সেই ভয়ানক শব্দ, হঠাৎ নেমে আসা অন্ধকার, আর আকাশ থেকে পড়তে থাকা রহস্যময় বাক্সগুলো।
অনেকে প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো ভূমিকম্প বা কোনো উল্কাপিণ্ড পড়ছে। কিন্তু ভোরে বাক্সের ভেতর যখন AK-47 এবং রকেট লঞ্চার দেখা গেল, পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ, সেনা, এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী দ্রুত এলাকা ঘিরে ফেলে। কয়েকদিন ধরে পুরুলিয়া জেলার গ্রামগুলোকে নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে রাখা হয়।
আজকের দিনে পুরুলিয়া অস্ত্রকাণ্ডের তাৎপর্য
দীর্ঘ তিন দশক পরেও পুরুলিয়া অস্ত্রকাণ্ড আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক রহস্যের অন্যতম উদাহরণ। ঘটনা শুধু একটি অস্ত্র সরবরাহের নয় এটি দেখিয়েছিল নিরাপত্তা, কূটনীতি, গোয়েন্দা কার্যকলাপ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের জটিলতা।
ভারত তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে রাডার এবং আকাশপথ পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো হয়।
উপসংহার
পুরুলিয়া অস্ত্রকাণ্ড শুধুই একটি অপরাধ বা চোরাচালান নয় এটি ভারতের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত অধ্যায়। বহু প্রশ্নের আজও সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি কারা চেয়েছিল ভারতের মাটিতে অস্ত্র ছড়িয়ে দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে? কেনই বা সেই এলাকা নির্বাচিত হলো?
ইতিহাসের এই রহস্যময় ঘটনার বহু দিক হয়তো আর কখনোই পুরোপুরি পরিষ্কার হবে না। তবে এটি আজও স্মরণ করিয়ে দেয় দেশের নিরাপত্তা কোনোদিনই অবহেলার বিষয় নয়।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন